এ মাসের কবি : কবিতা সিংহ
শাশ্বতী সান্যাল
বাংলা কবিতার সুবিস্তীর্ণ অঙ্গনে চল্লিশ থেকে পঞ্চাশের দশকের মধ্যবর্তী সময়কাল
অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রবীন্দ্রপ্রভাব থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে বাংলা কবিতার নতুন পথচলা
শুরু হয়েছিল ত্রিশের দশক থেকেই। কবিতা পত্রিকাকে কেন্দ্র করে যে আন্দোলন
মাথা চাড়া দিয়েছিল, ক্রমে ৪০ আর ৫০ এর দশকে তাই আরও পরিব্যাপ্ত ও গাঢ়তর
রূপ নেয়। এই সময়কালেই বাংলা কবিতার অন্দরমহলে পা রাখলেন কবিতা সিংহ।
অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রবীন্দ্রপ্রভাব থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে বাংলা কবিতার নতুন পথচলা
শুরু হয়েছিল ত্রিশের দশক থেকেই। কবিতা পত্রিকাকে কেন্দ্র করে যে আন্দোলন
মাথা চাড়া দিয়েছিল, ক্রমে ৪০ আর ৫০ এর দশকে তাই আরও পরিব্যাপ্ত ও গাঢ়তর
রূপ নেয়। এই সময়কালেই বাংলা কবিতার অন্দরমহলে পা রাখলেন কবিতা সিংহ।
কবিতা সিংহের জন্ম ১৯৩১ সালের ১৬ই অক্টোবর, কলকাতার ভবানীপুরে। বাল্যকাল
থেকেই অত্যন্ত পরিণত মনের অধিকারিণী ছিলেন কবিতা, এবং খুব কম বয়সেই
লেখালিখির জগতে পা রাখেন তিনি। জন্মসূত্রে বাড়িতেও সাংস্কৃতিক পরিবেশ
পেয়েছিলেন। মা অন্নপূর্ণা সিংহ কবিতা লিখতেন, ছবি আঁকতেন। বাবার ছিল সেতার
বাজানোর শখ। বালিকাবয়সেই কবিতা সিংহ এই সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের যথাযোগ্য
উত্তরাধিকার লাভ করেন। বিশেষত তাঁর সামগ্রিক জীবনে মা অন্নপূর্ণাদেবীর অত্যন্ত
গভীর প্রভাবের কথা তিনি নিজেই একাধিকবার উল্লেখ করে গেছেন। মায়ের প্রণোদনায়
স্বাধীন লেখালিখির চর্চার পাশাপাশি নাচ- গান- ছবি আঁকার চর্চাও শুরু করেছিলেন তিনি।
অবশ্য পরবর্তীতে এসব চিরাচরিত ললিতকলার ক্ষেত্র ছাড়িয়ে স্বাধীন মতপ্রকাশের ক্ষেত্রটিতেই
তিনি নিজের ব্যক্তিত্বের যথাযোগ্য পরিস্ফুটনের পটভূমি হিসাবে বেছে নিয়েছিলেন।
তবু বলতেই হয়, এই বহুমুখী চর্চা ও চর্যা তাকে দিয়েছিল স্বাধীন জীবনের স্বাদ ও ছন্দ, যা তার
আজীবনের সাহিত্যসাধনায় অক্সিজেনের কাজ করে গিয়েছে।
থেকেই অত্যন্ত পরিণত মনের অধিকারিণী ছিলেন কবিতা, এবং খুব কম বয়সেই
লেখালিখির জগতে পা রাখেন তিনি। জন্মসূত্রে বাড়িতেও সাংস্কৃতিক পরিবেশ
পেয়েছিলেন। মা অন্নপূর্ণা সিংহ কবিতা লিখতেন, ছবি আঁকতেন। বাবার ছিল সেতার
বাজানোর শখ। বালিকাবয়সেই কবিতা সিংহ এই সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের যথাযোগ্য
উত্তরাধিকার লাভ করেন। বিশেষত তাঁর সামগ্রিক জীবনে মা অন্নপূর্ণাদেবীর অত্যন্ত
গভীর প্রভাবের কথা তিনি নিজেই একাধিকবার উল্লেখ করে গেছেন। মায়ের প্রণোদনায়
স্বাধীন লেখালিখির চর্চার পাশাপাশি নাচ- গান- ছবি আঁকার চর্চাও শুরু করেছিলেন তিনি।
অবশ্য পরবর্তীতে এসব চিরাচরিত ললিতকলার ক্ষেত্র ছাড়িয়ে স্বাধীন মতপ্রকাশের ক্ষেত্রটিতেই
তিনি নিজের ব্যক্তিত্বের যথাযোগ্য পরিস্ফুটনের পটভূমি হিসাবে বেছে নিয়েছিলেন।
তবু বলতেই হয়, এই বহুমুখী চর্চা ও চর্যা তাকে দিয়েছিল স্বাধীন জীবনের স্বাদ ও ছন্দ, যা তার
আজীবনের সাহিত্যসাধনায় অক্সিজেনের কাজ করে গিয়েছে।
আপাতভাবে সংস্কৃতিমনস্ক শিক্ষিত পরিবারের সন্তান হলেও, আসলে কবিতা সিংহের পিতৃকুল
ছিল অত্যন্ত উন্নাসিক এবং অন্তরধর্মে সংকীর্ণ। জন্ম থেকেই বাড়িতে নারী ও পুরুষের
অধিকারে বিভাজন দেখতে অভ্যস্ত পড়েছিলেন তিনি। বাড়ির ছেলেদের জন্য যেখানে কলকাতার
সম্ভ্রান্ত স্কুল নির্দিষ্ট ছিল, সেখানে বাড়ির মেয়েদের ভর্তি করা হত অতি সাধারণ বেলতলা গার্লসে।
এই বেলতলা গার্লস স্কুলেই পরিবারের অন্যান্য মেয়েদের মতো কবিতা সিংহেরও প্রাথমিক স্কুলজীবন
শুরু হয়। স্কুলের শিক্ষা সম্পূর্ণ করে তিনি ভর্তি হন প্রেসিডেন্সি কলেজে। কিন্তু ১৯৫১ সালে
মাত্র কুড়ি বছর বয়সে বাড়ির অমতে বিমল রায়চৌধুরীকে বিবাহ করার পর তার পড়াশোনায়
এক দীর্ঘ ছেদ ঘটে। বিবাহের প্রায় সাত বছর পর যোগমায়া দেবী কলেজ থেকে তিনি বোটানিতে
অনার্স নিয়ে তার স্নাতকের পড়াশুনো শেষ করেন। ব্যক্তিগত জীবনের নানা উত্থানপতন, লিঙ্গভিত্তিক
বিভাজন, নারীদের দুঃখদুর্দশা তার কবিতায় বারবার ফিরে ফিরে এসেছে।
ছিল অত্যন্ত উন্নাসিক এবং অন্তরধর্মে সংকীর্ণ। জন্ম থেকেই বাড়িতে নারী ও পুরুষের
অধিকারে বিভাজন দেখতে অভ্যস্ত পড়েছিলেন তিনি। বাড়ির ছেলেদের জন্য যেখানে কলকাতার
সম্ভ্রান্ত স্কুল নির্দিষ্ট ছিল, সেখানে বাড়ির মেয়েদের ভর্তি করা হত অতি সাধারণ বেলতলা গার্লসে।
এই বেলতলা গার্লস স্কুলেই পরিবারের অন্যান্য মেয়েদের মতো কবিতা সিংহেরও প্রাথমিক স্কুলজীবন
শুরু হয়। স্কুলের শিক্ষা সম্পূর্ণ করে তিনি ভর্তি হন প্রেসিডেন্সি কলেজে। কিন্তু ১৯৫১ সালে
মাত্র কুড়ি বছর বয়সে বাড়ির অমতে বিমল রায়চৌধুরীকে বিবাহ করার পর তার পড়াশোনায়
এক দীর্ঘ ছেদ ঘটে। বিবাহের প্রায় সাত বছর পর যোগমায়া দেবী কলেজ থেকে তিনি বোটানিতে
অনার্স নিয়ে তার স্নাতকের পড়াশুনো শেষ করেন। ব্যক্তিগত জীবনের নানা উত্থানপতন, লিঙ্গভিত্তিক
বিভাজন, নারীদের দুঃখদুর্দশা তার কবিতায় বারবার ফিরে ফিরে এসেছে।
বাংলা কবিতায় কামিনী রায়, রাধারানী দেবী প্রমুখের লেখায় নারীস্বাধীনতার, তথা নারীবাদী চেতনার
যে অঙ্কুরিত রূপটি দেখা দিতে শুরু করেছিল, তাই যেন যথার্থ প্রস্ফুটিত চেহারা নিয়ে ধরা দেয়
কবিতা সিংহের কবিতাভাষায়।
যে অঙ্কুরিত রূপটি দেখা দিতে শুরু করেছিল, তাই যেন যথার্থ প্রস্ফুটিত চেহারা নিয়ে ধরা দেয়
কবিতা সিংহের কবিতাভাষায়।
কবিকে নারী বা পুরুষ এই স্বতন্ত্র লিঙ্গপরিচয়ে চিহ্নিত করে দেওয়ার ঘোর বিরোধী ছিলেন তিনি।
তাই 'নারীকবি' শিরোনাম ভেঙে নিজের কবিসত্তাকেই বারবার দৃঢ়ভাবে পাঠকদের সামনে তুলে
ধরতে চেয়েছেন । বলাই বাহুল্য, তার কবিতার জ্বলন্ত বিষয়ভাবনা ও বক্তব্য উপস্থাপনার তীব্রতা
কবিতা সিংহকে তাঁর সমকালের থেকে বহুলাংশে এগিয়ে রেখেছে।
তাই 'নারীকবি' শিরোনাম ভেঙে নিজের কবিসত্তাকেই বারবার দৃঢ়ভাবে পাঠকদের সামনে তুলে
ধরতে চেয়েছেন । বলাই বাহুল্য, তার কবিতার জ্বলন্ত বিষয়ভাবনা ও বক্তব্য উপস্থাপনার তীব্রতা
কবিতা সিংহকে তাঁর সমকালের থেকে বহুলাংশে এগিয়ে রেখেছে।
মাত্র ষোলো বছর বয়সে আনন্দবাজার পত্রিকায় বিজ্ঞাপনে নারীশরীরের ব্যবহার নিয়ে একটি
প্রবন্ধ লেখেন কবিতা সিংহ। প্রবন্ধের শিরোনাম ছিল 'আর্ট ও নারী'। তারও আগে মাত্র ১৫ বছর
বয়সেই তার প্রথম কবিতা প্রকাশিত হয় নেশন পত্রিকায়। অর্থনৈতিক দুর্দশা ও দারিদ্রের কারণে
জীবনের প্রথমপর্বে বিভিন্ন ধরণের পেশার সঙ্গে যুক্ত থাকলেও মূলত সাংবাদিক হিসাবেই পেশাগত
ক্ষেত্রে তিনি প্রসিদ্ধি লাভ করেন। আধুনিক কর্মজীবী সৃজনশীল নারীর এক সার্থক রূপ ছিলেন কবিতা সিংহ।
প্রবন্ধ লেখেন কবিতা সিংহ। প্রবন্ধের শিরোনাম ছিল 'আর্ট ও নারী'। তারও আগে মাত্র ১৫ বছর
বয়সেই তার প্রথম কবিতা প্রকাশিত হয় নেশন পত্রিকায়। অর্থনৈতিক দুর্দশা ও দারিদ্রের কারণে
জীবনের প্রথমপর্বে বিভিন্ন ধরণের পেশার সঙ্গে যুক্ত থাকলেও মূলত সাংবাদিক হিসাবেই পেশাগত
ক্ষেত্রে তিনি প্রসিদ্ধি লাভ করেন। আধুনিক কর্মজীবী সৃজনশীল নারীর এক সার্থক রূপ ছিলেন কবিতা সিংহ।
বাংলা সাহিত্যজগতে এক অক্লান্ত ও অনমনীয় কবি হিসাবেই কবিতা সিংহ চিরস্মরণীয় থাকবেন।
কবিতার পাশাপাশি গল্পকার ও ঔপন্যাসিক হিসাবেও তিনি পাঠকহৃদয়ে রেখাপাত করে গেছেন।
শ্রেষ্ঠ কবিতার ভূমিকায় কবি নিজেই জানিয়েছেন প্রায় চার দশক জুড়ে ছোট বড় বিভিন্ন পত্রপত্রিকায়
অজস্র কবিতা লিখেছেন তিনি। সেসব লেখা গ্রন্থিত হলে তার কাব্যগ্রন্থের সংখ্যা অতি প্রসবের দোষে পড়ত।
তাঁর কবিতার বইয়ের সংখ্যা তিনটি।
কবিতার পাশাপাশি গল্পকার ও ঔপন্যাসিক হিসাবেও তিনি পাঠকহৃদয়ে রেখাপাত করে গেছেন।
শ্রেষ্ঠ কবিতার ভূমিকায় কবি নিজেই জানিয়েছেন প্রায় চার দশক জুড়ে ছোট বড় বিভিন্ন পত্রপত্রিকায়
অজস্র কবিতা লিখেছেন তিনি। সেসব লেখা গ্রন্থিত হলে তার কাব্যগ্রন্থের সংখ্যা অতি প্রসবের দোষে পড়ত।
তাঁর কবিতার বইয়ের সংখ্যা তিনটি।
১. সহজসুন্দরী - প্রকাশকাল ১৯৬৫
২.কবিতা পরমেশ্বরী - প্রকাশকাল ১৯৭৬
৩. হরিণাবৈরী - প্রকাশকাল ১৯৮৫
এছাড়াও, তাঁর রচিত উপন্যাসের মধ্যে রয়েছে সোনারূপার কাঠি (১৯৫৬), পাপপুণ্য পেরিয়ে ( ১৯৬৪),
চারজন রাগী যুবতী প্রভৃতি। কবিতা সিংহের গল্পগ্রন্থের সংখ্যা দুই। তাঁর ‘শ্রেষ্ঠ গল্প’ প্রকাশিত হয়েছিল
১৯৮৪ সালে। এরপর ১৯৮৮-তে বেরোয় আরও একটি সংকলন ‘একদিন আশালতা’। সম্প্রতি প্রকাশিত
হয়েছে কবিতা সিংহের পঞ্চাশটি গল্প (জানুয়ারি, ২০১৩)।
চারজন রাগী যুবতী প্রভৃতি। কবিতা সিংহের গল্পগ্রন্থের সংখ্যা দুই। তাঁর ‘শ্রেষ্ঠ গল্প’ প্রকাশিত হয়েছিল
১৯৮৪ সালে। এরপর ১৯৮৮-তে বেরোয় আরও একটি সংকলন ‘একদিন আশালতা’। সম্প্রতি প্রকাশিত
হয়েছে কবিতা সিংহের পঞ্চাশটি গল্প (জানুয়ারি, ২০১৩)।
কবিতা সিংহের শ্রেষ্ঠ কবিতা প্রকাশ পায় ১৯৮৭ সালে। শ্রেষ্ঠ কবিতার ভূমিকায় কবি জানিয়েছেন তাঁর
কাব্যগ্রন্থগুলি "অজস্র রচনার সাক্ষ্য নয়, অজস্র বিসর্জনের প্রমাণ"।
কাব্যগ্রন্থগুলি "অজস্র রচনার সাক্ষ্য নয়, অজস্র বিসর্জনের প্রমাণ"।
কবিতা সিংহের দশটি কবিতা
আমিই সেই মেয়েটি
আমিই সেই মেয়েটি সেই মেয়ে
যার জন্মের সময় কোন শাঁখ বাজেনি
জন্ম থেকেই যে জ্যোতিষীর ছঁকে বন্দী
যার লগ্ন রাশি রাহু কেতুর
দিশা খোঁজা হয়েছে না, তার নিজের জন্য নয়
তার পিতার জন্য আর ভাই এর জন্য
তার স্বামীর জন্য তার পুত্রের জন্য
কিন্তু যার গর্ভ থেকে আমার জন্ম
সেই মায়ের কথা বলেনি কেউ।
আমিই সেই মেয়েটি সেই মেয়েটি
যে জন্ম থেকেই বিবাহের
জন্য বলি প্রদত্ত
যার বাইরের চেহারা
চোখ – নাক-মুখ- ত্বক- চুল – রঙ
নিয়েই দর কষাকষি
কাল না ফর্সা
খাঁদা না টিকালো
লম্বা না বেঁটে
খুতখুতে না টানা টানা
যার মাথার বাইরেটা নিয়েই সকলের ভাবনা
মাথার ভিতরটা নিয়ে কারও কোন মাথা ব্যথা নেই
আমিই সেই মেয়েটি যে ছোটবেলা থেকে শুনেছে
জোরে জোরে কথা বলতে নেই
ছুটতে নেই -চেঁচাতে নেই- হাসতে নেই
এমন কি কাঁদলেও তা লুকিয়ে লুকিয়ে
আমিই সেই মেয়েটি যাকে বলতে নেই –
খিদে পেয়েছে – ঘুম পেয়েছে – ইচ্ছে করছেনা-
ক্লান্ত লাগছে -আর পারছিনা — আর পারছিনা।
আমিই সেই মেয়েটি খেলার জন্য যার
হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে পুতুল
পুতুলের আদল পাবার জন্য
পুতুলের সংসার বানাবার জন্য।
আমিই সেই মেয়েটি যে গত কোন
শতাব্দী তে পাঁচ বছর বয়সে মালা দিয়েছে –
গঙ্গা যাত্রীর গলায়
কুলীন ব্রাম্মন এর তিনশো পঁয়ষট্টি তম স্ত্রীর
অন্যতমা হয়ে স্বামীর গরবে হয়েছি গরবিনী
একাদশীর দিন অবুজ দশমীর বালিকার তৃষ্ণায় –
আটক ঘরের মাটি লেহন করতে করতে প্রান ত্যাগ করেছি
সন্তানের পর সন্তান জন্ম দিতে দিতে যন্ত্রণায়
মুখ থুবড়ে পরেছি সূতিকাগারে
জ্বলে পুড়ে মরেছি সতীদাহে।
আমি বুঝতে পারিনি যে চাকরীর জায়গায়
নিজের কাজের কুশলতা দেখাতে নেই
আমি বুঝতে পারিনি যে আমার প্রেমিককে
তার প্রেম পত্রের বানান ভুল গুল ধরিয়ে দেওটাই
আমার ভুল হয়ে ছিল
আমি বুঝতে পারিনি আমি যদি কবি হতে চাই
আমার বন্ধুরা বলবে ''ওটা কবিতা হয়নি পদ্য হয়েছে''
আমি বুঝতে পারিনি যে বিংশ শতাব্দীর শেষ সীমানায় এসে দাড়িয়েও
এইপুরুষ শাসিত সমাজ বুদ্ধিমতিদের জন্য অপ্রস্তুত
আমি সেই মেয়েটি যে দেখেছে একটি নারী
কেমন করে নিছক মেয়েছেলে বনে যায়
চরিত্রের উলটো দিকে হেঁটে যায় সফল স্বামীদের গিন্নীরা
শিক্ষার চেয়ে উজ্জলতা পায় বেনারসি সাড়ীর ফুলকি
বুদ্ধির চেয়ে দিপ্তিমান হয়ে ওঠে অন্ধকারে হীরা পান্না
আমি সেই মেয়েটি জানেন আমি সেই মেয়েটি
যে জীবনের কয়েকটি বছর ভুলের পরে ভুল
পুনরুপি ভুল করে চলেছি
অন্ধকারের দিনে ফিরতে পারিনা বলেই কি
আমি অপমানের জলন্ত কয়লার উপর দিকে হেঁটে যেতে চাই
যেতে চাই দুঃখের দিকে
আমি প্রনাম জানাই সেই প্রথম আগুনকে
যার নাম বর্ণপরিচয়
সেই অগ্নি সুদ্ধ পরম্পরাকে সেইসব পুরুষ রমণীকে
যারা উনবিংশ শতাব্দীর অন্ধকারের হাতলে জ্ঞানের আলো জ্বালিয়ে
এক জন্মে আমাকে জন্ম জন্মান্তরের দরজা খুলে দিয়েছে।
আমি আজ প্রেমের জন্য ফেলে যাচ্ছি আরাম-
শোকার্জিত শাকান্নের জন্য ফেলে যাচ্ছি ক্রীতদাসের চর্ব্যচোষ্য
জেগে থাকার জন্য ফেলে যাচ্ছি ভাত ঘুম,
যন্ত্রণার জন্য ফেলে যাচ্ছি সুখ –
জ্ঞানের জন্য ফেলে যাচ্ছি অন্ধতা
আনন্দের জন্য ফেলে যাচ্ছি সাফল্য
অমৃতের জন্য ঐশ্বর্য।
আমার হাতে জ্বলছে দিশারীদের শিক্ষার মহান আগুন
আমিই সেই মেয়েটি———
আপনারা নিজের দর্পণে দেখে আমাকে চিনুন
আমাকে চিনুন – আমাকে চিনুন।।
পৃথিবী দেখে না
কিছু কি আলাদা রাখো?
শমীবৃক্ষে রমণীহে একা?
সত্যকার এলোচুল সত্যকার রমণী-নয়ন
সত্যকার স্তন?
খুলে রাখো নিজস্ব-ত্রিকোণ?
তারপর চলে যাও বিরাট রাজার ঘরে-
আহা যেন স্মৃতিভ্রষ্ট অজ্ঞাতবাসিনী
খুলে রেখে চলে যাও সত্যকার শ্রোণী
হাসো তুমি অপমানে ছিন্নভিন্ন, হাসো বিমোহিনী
যে ভাবে অনন্তকাল হাসে বৃহন্নলা
যে ভাবে রমণীসমা ছুঁড়ে দাও কৌতুকের মত
ঘোরতর পরিহাস, ক্রূর দিব্যছলা
ভেঙে দাও সত্যতাকে মাড়াও ব্যবসা, ওরা
তোমার বিধ্বংসী তেজ বাণিজ্য বোঝে না
গঠনের মধ্যে চুর ভাঙনের সঙ্কেত বোঝে না-
নিজের ভিতরে তুমি একা কাঁদো
বড় অশ্রুহীন
বন্ধ রাখো ত্রিকালদর্শী ত্রিনয়ন
সত্যকার সঙ্গমের রণ
কে দেবে তোমার নারী?
কোথায় সে পুরুষোত্তম?
তাই অভিনবা!
শমীবৃক্ষে শস্ত্র খুলে রাখো
খুলে রাখো রমণী ধরম
কিম্পুরুষের সঙ্গে ঘটে যায় পৃথিবীর
সমস্ত অফলা সঙ্গম!
আজন্ম আলাদা রাখো শমীবৃক্ষে রমণীহে একা
তোমার অনন্ত শক্তি
ধ্বংসে ছুটে যেতে যেতে
মূর্খের স্বর্গের মত পৃথিবী দেখে না
ভ্রূণা
আমরা ভ্রূণ না ভ্রূণা
জন্ম দিও না মা!
মা আমার জেনে শুনে কখনো উদরে
ধরোনা এ বৃথা মাংস
অযাচিত কখনো ধরোনা।
আর ভয় নেই কোনো ভয়
যত গর্ভবতী ভাঙো শোক
নিশ্চিন্ত হোক সর্বলোক
হলুদ-বসন্ত পাখি ডাকুক নির্ভীক স্বরে হোক
গেরস্তের ঘরে ঘরে
খোকা হোক! খোকা হোক! শুধু খোকা হোক!
হরিণাবৈরী
অঘোর গৈরী পথ বৈরাগিনী
পথ না আগুন নদী ক্রূর-গামিনী
পোড়ে চুল জ্বলে ত্বক
নাঙা পদ ধক্ ধক্
জানে না সে ঘোরে ক্রোধ লোভী কামিনী
শাঁখিনী হাকিনী ধায় খরডাকিনী
কোথা রে হরিণ তুই চিন্তামণি?
বৈরী আপনা মাসে তোর হরিণী!
হরিণী জানে না ঘর, কোথা রে হরিণ?
একতারা হয়ে যায় তার ছিঁড়ে বীণ্
শিখা খায় লক্ লক্
আগুনে আহুতি হোক
চোখ নাক স্তন ত্বক মাংসের ঋণ
বৈরী আপনা মাসে হরিণা অচিন্
একেলা নিলয় খোঁজে কোথা রে হরিণ?
অপমানের জন্য ফিরে আসি
অপমানের জন্য বার বার ডাকেন
ফিরে আসি
আমার অপমানের প্রয়োজন আছে!
ডাকেন মুঠোয় মরীচিকা রেখে
মুখে বলেন বন্ধুতার_বিভূতি__
আমার মরীচিকার প্রয়োজন আছে।
অপমানের জন্য বার বার ডাকেন
ফিরে আসি
উচ্চৈঃশ্রবা বিদূষক-সভায়
শাড়ি স্বভাবতই ফুরিয়ে আসে
আমার যে
কার্পাসের সাপ্লাই মেলে না।
অপমানের জন্য বার বার ডাকেন
ফিরে আসি
ঝাঁপ খুলে লেলিয়ে দেন কলঙ্কের অজস্র কুক্কুর-
আমার কলঙ্কের প্রয়োজন আছে!
যুদ্ধরীতি পাল্টানোর কোনও প্রয়োজন নেই
তাই করমর্দনের জন্য
হাত বাড়াবেন না।
আমার করতলে কোনও অলিভচিক্কন কোমলতা নেই
বিসর্জনের পর
বিসর্জনের পর বুঝেছি জেনেছি
একদিন পূজা হয়েছিল।
আজ তাই অন্ধকারে ফিরে ফিরে
অকাল বোধন।
তারপর চোখ চুল হাসি কথা
টুপটাপ অন্ধকারে ফেলে
বাড়তি আত্মার কাছে জেনে নিই
কাকে বিসর্জন?
জেনে নিই কে কার প্রতিমা।
দেহ
কি চাও, দেখনা ওই দাঁড়ায়েছে ইন্দ্রজালিকা
মাত্র ওই দেহ আছে, জাদুযষ্ঠি, কল্পগাছ-দেহ
তবুও যষ্ঠির জাদু ভেদ করে উঠে আসে ক্রমে
কাঙ্ক্ষিত, কাঙ্ক্ষিত নয়, এমন যদৃচ্ছা যাবতীয়।
কি নেবে দেহের থেকে? মাংস মেদ বসা?
প্রাগৈতিহাসিক অগ্নি? পোড়া মাংসের ঘ্রাণ, রক্ত- পানীয়
নখ দাঁত চুল কিংবা অন্নপাত্র দিব্য করোটি?
অথবা কি নিষ্কাশন করে নেবে প্রতিভা ও মেশিনের মিশ্র কুশলতা?
অথবা জাদুর টুপি যেভাবে ওড়ায় লক্ষ কুন্দ পায়রা
সেভাবে দেহের থেকে চাড় দিয়ে ক্রমাগত খুলে নেবে শিশু!
যা চাও, তা পাবে তুমি, কটিতে দু'হাত রেখে
দু-ঊরু তফাৎ করে দাঁড়ায়েছে তীব্র ভানুমতী
ইচ্ছা হলে, দেহ থেকে ফোটাবে সে যথেচ্ছ বিদেহ
যষ্ঠির হেলনে তার করতলে মুদ্রা হবে, মাছ পদ্ম বরাহ হরিণ
চরণ ফোটাবে ছন্দ; তুলির মুখের থেকে ছুটে যাবে সাঙ্কেতিক গুহাচিত্ররেখা
তবু তার শ্রেষ্ঠ খেলা, শেষ খেলা, যতক্ষণ থেকে যাবে দেহ
তোমাকে সমস্ত দিয়ে সঙ্গোপনে রেখে দেওয়া
একতিল ফিরোজা সন্দেহ।
অপাপবিদ্ধ সূর্য
প্রত্যেক সকাল এক অপাপবিদ্ধ সূর্য আনে
সারাদিন সূর্য করে অকারণ নরকদর্শন
পৃথিবী দেখায় তাকে তার যত রৌরব নরক!
তবু সূর্য শিক্ষা নেয় এক বিন্দু পুণ্যের সমীপে
অস্ত যাবার আগে ডেকে দেয় আরেক সূর্যকে!
ঈশ্বরকে ইভ
আমিই প্রথম
জেনেছিলাম
উত্থান যা
তারই ওপিঠ
অধঃপতন!
আলোও যেমন
কালোও তেমন
তোমার সৃজন
জেনেছিলাম
আমিই প্রথম।
তোমায় মানা
বা না মানার
সমান ওজন
জেনেছিলাম
আমিই প্রথম।
জ্ঞানবৃক্ষ
ছুঁয়েছিলাম
আমিই প্রথম
লাল আপেলে
পয়লা কামড়
দিয়েছিলাম
প্রথম আমিই
আমিই প্রথম।
আমিই প্রথম
ডুমুর পাতায়
লজ্জা এবং
নিলাজতায়
আকাশ পাতাল
তফাৎ করে
দেওয়াল তুলে
দিয়েছিলাম
আমিই প্রথম।
আমিই প্রথম
নর্ম সুখের
দেহের বোঁটায়
দুঃখ ছেনে
অশ্রু ছেনে
তোমার পুতুল
বানানো যায়
জেনেছিলাম
হেসে কেঁদে
তোমার মুখই
শিশুর মুখে
দেখেছিলাম
আমিই প্রথম।
আমিই প্রথম
বুঝেছিলাম
দুখে সুখে
পুণ্য পাপে
জীবন যাপন
অসাধারণ
কেবল সুখের
শৌখিনতার
সোনার শিকল
আমিই প্রথম
ভেঙেছিলাম
হইনি তোমার
হাতের সুতোয়
নাচের পুতুল
যেমন ছিল
অধম আদম
আমিই প্রথম
বিদ্রোহিনী
তোমার ধরায়
আমিই প্রথম।
প্রিয় আমার
হে ক্রীতদাস
আমিই প্রথম
ব্রাত্যনারী
স্বর্গচ্যুত
নির্বাসিত
জেনেছিলাম
স্বর্গেতর
স্বর্গেতর
মানব জীবন
জেনেছিলাম
আমিই প্রথম।
মহাশ্বেতা
(মহাশ্বেতা দেবীকে)
অগ্নিরও অন্তিম রূপ শ্বেত
রক্ত কমলা কিংবা অতসী বর্ণের নয় জিহ্বা করাল
সিন্দুর অগ্নিল কিংবা আতপ্ত কাঞ্চন
অতবেশি অগ্নি-ভীষণ?
যেখানে অগ্নির কোনো চঞ্চলতা নেই
শুভ্রতার ভিতরে শুভ্রতা
যেখানে ফারেনহিট ছেড়ে দেয় সমস্ত মাপন
কুনকে ডোবালে ওঠে এক এক রানীর মোহর
সেখানে তোমার স্থির ঘর
কে যাবে সেখানে নারী? ধর্ম অর্থ কাম মোক্ষ ফেলে?
তুমি কেন তিন'শ বছর আগে
এই ভুল পৃথিবীতে এলে?
No comments:
Post a Comment