Monday, October 15, 2018

মুহূর্তের কবিতা



মুহূর্তের কবিতা  
রজতকান্তি সিংহচৌধুরী

কবিতার প্রথম লাইনটি ঈশ্বরপ্রেরিত। এমন কথাই বলেছিলেন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়।তাঁকে ঈশ্বর বিশ্বাসী  ভাবা কঠিন। তাহলে? হেগেলের একটা কথা আছে না, ‘সেকুলারাইজেশন অব্‌ দি স্পিরিচুয়াল’? যে কোনো কবিতাই, তাই আত্মিক, ধর্মনিরপেক্ষ হয়েও। প্রাত্যাহিকতার বেড়াজাল  ছাড়িয়ে এই আত্মিকতায় পৌঁছনোই কবিতা লেখার, কবিতা পড়ারও মূলে। দেহ মনের সুদূরপারে সেই  স্পন্দনময় অতিরেকের জগৎকে শুধু আত্মিকতা নয়,আধ্যাত্মিকতা বলেও অভিহিত করেন কেউ কেউ।সেই আধ্যাত্মিকতা  ঈশ্বর বিশ্বাসের থেকে স্বতন্ত্র।
কবিতা তো  জীবনযাপনেরই শিল্পিত নির্যাস গজদন্ত মিনারবাসীর ছলাকলা কিংবা মৃণালভুকের স্বেচ্ছাচার নয়। কথিত আছে, স্বাতী নক্ষত্রের জল বিশেষ মুহূর্তে শুক্তিতে পড়লে মুক্তার জন্ম  হয়। কবিতার জন্মকথাও তেমনি রহস্য চঞ্চলসমকালের শিল্প তো সে বটেই, কিন্তু সর্বোপরি চিরকালীন।
কোন রসায়নে কবিচিত্তে একটি অনুভূতি কবিতায় শিল্পিত হয়ে ওঠে সেই রহস্যের চাবিকাঠি চির অজানা। সৃষ্টিকর্মে এক ধরনের স্বতঃস্ফূর্ততাও কবিতার অঙ্গাঙ্গী। কবির সত্তা তাঁর কাব্য বিশেষের সঙ্গে এমনভাবে মিশে যায় যে প্রায় তাঁর সাময়িক আত্ম বিলোপ ঘটে । আমাদের মন্ত্রাচার্য  জন কিট্‌স যাকে বলেছেন, ‘Negative Capability’ এক মহতী অনিশ্চিতিও যার সঙ্গে ওতপ্রোত।শ্রেষ্ঠ কবিও বোধ হয় আসুন, একটা কবিতা লিখিবলে পরিকল্পনামাফিক কবিতা লিখতে পারবেন না।  মনের আলো আঁধারির ছন্দোস্পন্দ স্বয়ং কবিরও অজানা।
কবিতার মূলে কবিচিত্রের আকুতি থাকবেই । বেদকে যে অপৌরুষেয়বলা হয় তার মানেটা কী? ঋষিরা মন্ত্রদ্রষ্টা, স্রষ্টা নন। ঋষিদের কাছে বেদ অর্ষনকরে ছিলেন অর্থাৎ এসেছিলেন।তাই তো তাঁরা ঋষি। আধুনিক কবিতার দিশারী জীবনানন্দের কথাতেও এর প্রতিধ্বনি দেখা যাবে, ‘কবি যখন ভাবাক্রান্ত হন চোখও অনুভব করে যেন ছন্দবিদ্যুৎ। 
  মা নিষাদশ্লোক উচ্চারনের পরপরেই বাল্মীকি বলেছিলেন কিমিদং ব্যহৃতংময়া এর দুটো মানে হয়- ‘এ আমি কী বললামআর ‘এ কী আমিই বললামএই ‘ কিমিদং ব্যহৃতংময়াবিস্ময় শুধু আদিকবির নয়, আবহমান কবি প্রজন্মের।
স্মরণ  করি জন টেলরকে ২৭শে ফেব্রুয়ারী, ১৮১৮ তারিখে লেখা চিঠিতে কিটসের উচ্চারন,‘That it poetry comes not as naturally as the leaves to a tree, it had better  not come at all’ গাছে পাতার মতো আসবে কবিতা, নইলে এসে কাজ নেই। তাঁর কাছে চিন্তার চেয়েস্বতঃস্ফূর্ত, তাৎক্ষনিক  অনুভুতির  গুরুত্ব ছিল সমধিক। মুহূর্তকে চূড়ান্ত অনুভবের শিখরে উত্তীর্ণ করাই ছিল হ্রস্বজীবী এই কবির অভিপ্রায়, Nothing startles me beyond the Moment’
                   [দুই]
    ফিরছিলাম রেলপথে। বাঙ্গালোরে কন্ফারেন্স সেরে। তারিখটা মনে আছে। ২০জানুয়ারি, ১৯৯৮ মাঘমাসের সূচনা। পৌষসংক্রান্তি সদ্য অতিক্রান্ত। দক্ষিণাপথে ট্রেনের জানালা থেকে দেখে এসেছি প্রতিটি কুটিরদ্বারে পৌষসংক্রান্তি, তথা পোঙ্গলউৎসবের আলপনাআমাদের যেমন মকরসংক্রান্তি, দাক্ষিণাত্যে পোঙ্গল ঘরে ঘরে সদ্য আহৃত সুপক্ক শস্যের উৎসব। দীর্ঘ যাত্রার শেষে ট্রেন ঢুকল বাংলায় মেদিনীপুরে।মেদিনীপুর স্টেশন ছেড়ে আমাদের ট্রেন গড়িয়ে চলল ঢালু হয়ে নেমে আসা কাঁসাই নদীর সেতুর অভিমুখে। যাত্রাপথ খড়গপুর হয়ে হাওড়া। সেই পুরাতন শস্যশ্যামল বঙ্গভূমি। গোধূলির মায়াবীআলোতে দেখা যাচ্ছে নদীচরে দাবার ছকের মতো দানকাটা খেত । কোথাও হলুদ সর্ষেফুল। কোথাও বা শীতের আনাজের চাষ। ইতস্তত চরে বেড়াচ্ছে কাদাখোঁচা পাখির দল। মনে হল, এই যে মেদিনীপুর শহরে নতজানু হয়ে নদীর কাছে নেমে আসা-এ যেন আজকের নয়। সিন্ধু সভ্যতা থেকে মিশর-মেসোপটেমিয়ার সমস্ত নদীমাতৃক সভ্যতার মূলমন্ত্রঃ দেখনি নগরগুলি নতজানু নদীর নিকটেকাগজে কলমে একদিন উঠে এল ফেরাকবিতাটি যা অনেক পরে আমার প্রথম কবিতার বই ফেরা’- নামকবিতা হিসেবের প্রকাশিত-                                                                              ফেরা                                                                          যেখানে মেদিনীপুর ঢালু হয়ে নেমে আসে কাঁসাইয়ের বুকে 
 মোরাম-মেদুর মাঠ মোলায়েম হয়ে আসে গোধূলি আলোতে
চরে দানকাটা খেত-সর্ষেফুল-কাদাখোঁচা-শীতের আনাজ  
তোমাকে ফিরতে হবে একদিন এইখানে-এই কথা জেনো 
 মাধুকরী শেষ করে গ্রাম থেকে বার হয়ে আসে ওই হাতি ও মাহুত
এত ধান হয়েছে যে গৃহস্থ দুমুঠো দিতে পারে অথিথি পশুকে।

কত যুদ্ধ জয় পরাজয় পার হলে তবু বুঝতে পারনি
 শস্য না ফলাতে পারলে সব মাটি-গোলাঘর শূন্য পড়ে থাকে 
 দেখনি নগরগুলি চিরকাল নতজানু নদীর নিকটে 
ওখানে ফিরতে হবে তোমাকেও একদিন এই কথা জেনো।
 [নাম কবিতা, কাব্যগ্রন্থ ফেরা’] 

কবিতা লিখতাম। খাতায় পড়ে থাকত। অল্প বয়সে অমন কবিতা তো বাঙালি ছেলেরা সবাই লেখে। যেহেতু লেখা পাঁচজনকে দেখানো আমার ধাতে ছিল না, লেখাটা আদৌ কিছু হচ্ছে কিনা বুঝে ওঠা হত না।
 বহু পরে কবিতাটি যখন ২০০৮ সালে দেশপত্রিকায় প্রকাশিত হয়, তখন কৌতুককর ঘটনা ঘটেছিল একটি। বন্ধু ভাগ্য আমার বরাবরই ভাল। সেই সময় সিন্ধুর নান্দিগ্রামে সরকারের কৃষি জমি অধিগ্রহনের প্রতিবাদে দেশ উত্তাল। আমার এই কবিতাটি দেশএর পাতায় পড়ে আমার এক সহৃদয় বন্ধুবর এস এম এস করেছিলেন, ‘বিষয়টি কি নন্দীগ্রাম?ধরতে পেরেছি’?সবিনয়ে আমি জবাব দিলাম, ‘কবিতাটি ১৯৯৮এ লেখা।নন্দিগ্রামে কৃষিজমি রক্ষা আন্দোলনের বহু আগে। তবে রাম জন্মাবার আগেই বোধ হয় রামায়ণ রচনার রীতি চিরকালই                                                        .    আর কবিতার মানে নিয়ে মনান্তর করবার আগে মনে রাখা দরকার কবি আর্কিবল্ড  ম্যাকলিশের (Archibald Macleish) সদুক্তি ‘A poem should not mean/ But be’ (Ars poetica, 1926) প্রাচীন রোমান কবি হোরেসের বিখ্যাত কবিতার শিরোনাম ধার করে কবি বলছেন মানে বোঝানো নয়, হয়ে ওঠাটাই কবিতার ভবিতব্য।
                         
                               

7 comments:

Popular Posts

কানভাঙা অন্ধ দোতারা

কানভাঙা অন্ধ দোতারা   দেবহূতি সরকার ১ যে সুরের ওপর জমেছে ধূলারাশি মাঝে মাঝে পান করি তাকে । ধুলোয় নেশা ...